ঢাকার ধামরাইয়ে বিভিন্ন শিল্প কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্যপানি সরাসরি গাজিখালি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। ফলে এ নদীর পানি ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অপরদিকে ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধে নদীর আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। ফলে রোগবালাই সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে খ্যাতি রয়েছে তার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান নদীর। ছোট বড় প্রায় ৭০০টি নদ-নদী বয়ে গেছে এদেশের ওপর দিয়ে। বাড়িয়েছে বাংলাদেশের সৌন্দর্য। নদীবহুল দেশ বলে স্বভাবতই এদেশের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর দিয়ে নদীর প্রভাব রয়েছে। কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলাদেশে অসংখ্য নদীর সমাবেশ দেখে একে ‘জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলা বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বর্তমানে নদীগুলোর অবস্থা দেখলে মনে হবে কবিদের কবিতা কাল্পনিক গল্প!
অনুসন্ধানে জানা যায়,ধামরাই, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি, বিল ও জলাশয়ের উপর গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্প কারখানা। এগুলোর মধ্যে হাতেগোনা দু’চারটা বাদে প্রায় সবগুলোই ইটিপি নেই। পরিশোধন না করেই পাইপের মাধ্যমে তরল বর্জ্য নদী, খাল বিল ও ডোবায় ফেলে দূষিত করছে। ইতোমধ্যে নদী ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে এবং নদীর পানির দুর্গন্ধে চারপাশে বসবাস করা যাচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
আজকে নদীর এমন অবস্থা হয়েছে,এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল বর্জের কারণে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল কারখানাগুলো থেকে। এদের যে বর্জ্য নদীতে আসে তাতে ব্যাপক পানি দূষণ হচ্ছে। এখন এই নদীতে গোসল করা তো দূরের কথা নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায় না। নদীর পাশে যাদের বাড়ি তারা এই নদীর দুর্গন্ধে ঘুমাইতে পারে না। এই নদী দূষণের কারণে মানুষের অসুখ-বিসুখ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতেছে। এই নদীর গন্ধের কারণে যারা এখানকার ছাত্র,ছাএী,শিশু সহ বয়স্ক লোক আছে তাদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সমস্যা হইতেছে। ডায়রিয়া জনিত রোগ পানিবাহিত রোগ অন্যান্য বিভিন্ন রোগব্যাধি এই নদী দূষণের কারণে দেখা দিতেছে। আমরা এই নদীটার সুস্থতা ফিরে পেতে চাই। যদি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পানি এখানে দেয়া হয় সে পানিটা ইটিপি মাধ্যমে ট্রিটমেন্ট করে ছাড়া হোক। তাহলে এই নদীটা দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
নদীর পাড়ের বাথুলী কবরস্থান মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক বলেন,ছোটকালে আমরা দেখতাম এই নদীটা প্রানবন্তর ছিল। এখানে আমাদের বাপ-দাদা আরও আত্মীয়-স্বজন সবাই গোসল করত। আমাদের গবাদি পশুগোলোকে গোসল করাইতাম। বিশেষ করে আমাদের এলাকার ভিতরে রোগব্যাধী আগে ডায়রিয়া, কলেরা ছিল না। নদীর পানি এমন খারাপ হয়ে গেছে তার বাস্তব প্রমাণ আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। মনে হয় নদীতে চর পড়ে গেছে। আসলে এগুলো সম্পূর্ণ খারাপ পানি। কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তৈরি করে বর্জ্য ফেলতে। পানি শোষন না করে ফেলানোর কারণে আজকে আমাদের এই নদীটা এইরকম হয়ে গেছে। পানির অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। আমরা গোসল করতে পারি না। ২৫০ জনের উপরে ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে আমরা ঠিকমত মাদ্রাসায় বসবাস করতে পারি না। মোটকথা আমাদের এলাকায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে
দেশের বৃহৎ যমুনা নদী। আর এ যমুনা নদী থেকে উৎপত্তি ধলেশ্বরী আবার ধলেশ্বরী থেকে উৎপত্তি ধামরাইয়ের এ গাজীখালী নদী। গাজীখালী নদীটি আঁকাবাকা হয়ে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলা উপর দিয়ে বয়ে গেছে। উপজোলা বারবারিয়া এলাকা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটারে বাথুলি হয়ে বংশী নদীতে মিশেছে। এখন থেকে ১৫ থেকে ২০ বছর পূর্বে বর্ষা মাসে এ নদীতে স্রোত আর শুষ্ক মৌসুমে থাকতো স্বচ্ছ পানি। । এ নদীর পানি কৃষি কাজে সেচ হিসেবে ও ব্যবহার করা হতো। শুধুই কি তাই মানুষের গোসল থেকে শুরু করে গৃহস্থালি কাজে পর্যন্ত এ পানি ব্যবহার করা হতো। শুধু পানিই ব্যবহার করা হতো না সারা বছর এ নদী থেকে মাছ পাওয়া যেত। জেলেরা মাছ ধরতো আর এ মাছ বিক্রি করে জীবিকাও নির্বাহ করতো। মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ হতো এ নদী থেকে। এখন এ পানি ছোয়াও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এ নদীতে স্বচ্ছ পানি পাওয়া তো দুরের কথা মাছের বংশ পর্যন্ত নেই।
কারণ বিভিন্ন শিল্প কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্যপানি সরাসরি গাজিখালি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে।
নদীর আশপাশে ঘুরে দেখা গেছে, নদীর পানিতে কালো ও সাদা রঙের আস্তরণ পড়ে গেছে এবং দুর্গন্ধে টেকা দায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন আশপাশের শিল্প কারখানাগুলো কোনো পরিশোধন ছাড়াই বর্জ্য ফেলে দিচ্ছে নদীতে। ফলে মাছ মরে যাচ্ছে, কৃষিজমির উৎপাদন কমে গেছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “আগে এই নদীর পানি দিয়ে আমরা ধান চাষ করতাম, মাছ ধরতাম। এখন এই পানির গন্ধেই অসুস্থ লাগে। কেউ কিছু বলে না, প্রশাসনও যেন চোখ বন্ধ করে আছে।”
পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই নদী পুরোপুরি মৃত নদীতে পরিণত হবে, যা স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে।

Dhaka News36