পুকুর খনন প্রকল্পের কোটি টাকার মাটি বিক্রি করছেন ছাত্রদল নেতা

ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা, জলাধার সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাভার ও আশুলিয়াসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় খাস পুকুর খনন, সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প হাতে নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে জনকল্যাণমূলক এই প্রকল্পের আড়ালে সরকারি পুকুরের মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়।

এ ঘটনায় ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি ও সাভার উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মোহাম্মদ তমিজ উদ্দিনের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তমিজ উদ্দিনের ও তার অনুসারীদের একটি চক্র দিনের বেলায় নামমাত্র ট্রেজারি চালান জমা দিয়ে রাতে ভেকু (খননযন্ত্র) দিয়ে পুকুরের মাটি কাটছে। সেই মাটি বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। প্রশাসনের নির্ধারিত নিয়মনীতি ও নকশা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত গভীরতায় মাটি কাটায় পুকুরের পাড়, আশপাশের জমি, বসতবাড়ি ও চলাচলের রাস্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়রা প্রতিবাদ করেও প্রভাবশালী মহলের কারণে পাচ্ছেন না কোন প্রতিকার।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বাস্তবায়নে এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সাভার উপজেলার ১৮টি ইজারাবিহীন খাস পুকুর ও জলমহালসমূহের সংস্কার, উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্প (১ম পর্যায়) গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় চারটি প্যাকেজে মোট ২ কোটি ৬১ লাখ ৭১ হাজার ৩৫০ টাকা বরাদ্দ দিয়ে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

গত ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর এসব কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে ২০২৬ সালের ১৬ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুকুরগুলোর সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, প্রকল্প-৪-এর আওতায় শিমুলিয়া কাচারিবাড়ি, দেওয়ানবাড়ি, বদরউদ্দিন খান, তাজপুর, কবিরপুর ভুনাবাড়ি, বাইদগাঁও জিয়াস, কোনাপাড়া কচুশাক ও বাসাইদ পুকুর খনন ও সংস্কারের জন্য ৫৯ লাখ ২১ হাজার ৮৫০ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় মাদারীপুরের বিসিক এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স হাজী শরিয়ত উল্লাহ ট্রেডার্স’-কে। এর মধ্যে আশুলিয়ার ধামসোনা ইউনিয়নের সুগন্ধি এলাকার দেওয়ানবাড়ি পুকুর সংস্কারের জন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমাদের বসতভিটার চারপাশের মাটিও কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পুকুরের পাড় বলতে কিছুই রাখা হয়নি। ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছি। ছাত্রদলে সভাপতি তমিজ উদ্দিনই এই মাটি বিক্রির চক্রের মূল হোতা।

মাটি পরিবহন ও ইটভাটায় সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় মনিরের বক্তব্যেও উঠে এসেছে ছাত্রদল নেতা তমিজ উদ্দিনের নাম। মনির জানান, পুরো কার্যক্রমের সঙ্গে তমিজ উদ্দিনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। পুকুর থেকে কেটে নেওয়া মাটি আশুলিয়ার কুন্ডার দিকে অবস্থিত ‘এমেইলি’ নামের একটি ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতি ট্রাক মাটি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স হাজী শরিয়ত উল্লাহ ট্রেডার্স’-এর প্রতিনিধি মিজান বলেন, মাটি কাটার কাজে ছাত্রদল সভাপতি তমিজের লোকজন জড়িত। আমার কিছু বলার নেই। প্রভাবশালীরা যা করছে, আমি তা-ই দেখছি। আমি এখানে কবে গিয়েছি, তা-ও মনে নেই।

অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি তমিজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে অস্বীকার করেন।

তবে এর কিছুক্ষণ পর জনি দেওয়ান নামের এক ব্যক্তি নিজেকে ছাত্রদল নেতা পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেন এবং জানান, ছাত্রদলের সভাপতি তমিজ উদ্দিন তাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে দফারফার দায়িত্ব দিয়েছেন।

এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ পেলে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে, সে অনুযায়ী অতিরিক্ত মাটি বিক্রি কিংবা এ ধরনের অন্যান্য কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ও সহ-দপ্তর সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মুঠোফোন রিসিভ করেননি।

এদিকে, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাটি অবৈধভাবে বিক্রি এবং নিয়মবহির্ভূত খনন বন্ধে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরের পাড়, চলাচলের রাস্তা ও বসতবাড়ি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানান তারা।

  • Related Posts

    ছেলের এইচএসসি পাসের খবরে বিলুপ্ত হলো জেলা ছাত্রদলের কমিটি

    ছেলের এইচএসসি পাসের খবর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর বিলুপ্ত করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলা ছাত্রদলের কমিটি। সদ্য সাবেক জেলা সভাপতি শাহজাহান খানের ছেলের এইচএসসি পাসের বিষয়টি সামনে আসার পর এ সিদ্ধান্ত…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *